কানাডায় শতকোটি টাকা পাচার! কেডিএস-২ এর দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

কানাডায় শতকোটি টাকা পাচার! কেডিএস-২ এর দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ব্যাংকের ঋণের আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ দেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম কেডিএস গ্রুপের দুই পরিচালক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কানাডায় শতকোটি টাকা পাচারের গুরুতরঅভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বের করে তা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ দিয়ে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল বাড়ি, ব্যবসা ও সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে দীর্ঘ সময় ধরে এস আলম গ্রুপের মালিকানা প্রভাব থাকলেও কার্যত নিয়ন্ত্রণে ছিল কেডিএস গ্রুপের প্রভাবশালী একটি অংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যাংকটির ঋণনীতি ও পরিচালনা ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম রহমান এবং তার ভগ্নিপতি ব্যাংকটির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এস এম শামীম ইকবাল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলনের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়।

এস এম শামীম ইকবাল ও তার স্ত্রী হাসিনা ইকবাল কেডিএস গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাদের বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগে আদালত ইতোমধ্যে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত এই নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থের বড় একটি অংশ কানাডায় পাচার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেই অর্থ দিয়ে অন্টারিওর নর্থ ইয়র্ক এলাকার ফাইফশায়ার রোডে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনা হয়েছে। এছাড়া কানাডার বিভিন্ন শহরে আরও একাধিক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই বাড়ির ছবিও ছড়িয়ে পড়ে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি ঘেঁটে জানা যায়, ২০১৭ সালের শেষ দিকে এফ এম এগ্রো ফুডস লিমিটেডের নামে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের শুরুতে হিসাবটি গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠানটির নামে ৩৫ কোটি টাকার ঋণসীমা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে একই গ্রুপভুক্ত জেকটা লিমিটেডকে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত করে আরও ৩০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ অনুমোদন করা হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, এসব ঋণের একটি বড় অংশ কখনোই প্রকৃত ব্যবসায় ব্যবহার হয়নি। বরং টাকা বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এফ এম এগ্রো ফুডস ও জেকটা লিমিটেডের নামে নেওয়া ঋণের অধিকাংশই এখন খেলাপি।

নথিপত্র অনুযায়ী, মুরাবাহা টিআরসহ বিভিন্ন খাতে নেওয়া ৭৭ কোটি টাকার বেশি ঋণের বর্তমান স্থিতি প্রায় ৯৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে জেকটা লিমিটেডের নামে নেওয়া প্রায় ৪১ কোটি টাকার দায় মুনাফাসহ ৫০ কোটির বেশি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় এসব ঋণ এখন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এফ এম এগ্রো ফুডসের আড়ালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল এস এম শামীম ইকবালের হাতে। জেকটা লিমিটেডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ শেয়ারও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে একই পরিবার ব্যাংক পরিচালনা, ঋণ অনুমোদন ও ঋণগ্রহীতাড়তিন স্তরেই প্রভাব বিস্তার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানও অতীতে বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে আলোচিত ছিলেন। ন্যাশনাল ব্যাংকে পরিচালক থাকাকালে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। সম্প্রতি একটি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

একই পরিবারের আরেক সদস্য ও লিজেন্ড হোল্ডিংস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এস আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্বল তদারকির কারণে দেশের কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবার বা গোষ্ঠী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কেডিএস গ্রুপের চট্টগ্রাম অফিসে যোগাযোগ করা হলেও কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রতিষ্ঠানের কেউ গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে চাননি বলেও জানা গেছে।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ

- Advertisement -spot_img

এই বিভাগের আরও

- Advertisement -spot_img