আবাসন সংকটের সমাধান নয়, সুবিধাভোগীদের চাহিদা পূরণই অগ্রাধিকার

হুমায়ুন কবীর হেলালী : ঢাকায় আবাসন সংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়। জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জমির অপ্রতুলতার কারণে রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যে আবাসন প্রকল্পগুলো নিয়েছে, সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে আবাসন সংকট লাঘব করা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। বরং এসব প্রকল্প বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

রাজউক ১৯৯৫ সালে ঢাকার অদূরে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প নেয়। রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৬ হাজার ১৫০ একর জমিতে ২৫ হাজার প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে একটি আধুনিক শহর গড়ে তোলার কথা ছিল। এর দুই বছর পর, ১৯৯৭ সালে কেরানীগঞ্জে শুরু হয় ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প। সেখানে ১ হাজার ৭৬৭টি প্লটের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য প্রায় ৯ হাজার ৫০০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তিন দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্প দুটির কোনোটিই কার্যত পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।

এই ব্যর্থতার পেছনে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতি। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিকল্পিত প্রকল্পে বিশেষ বিবেচনায় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আমলা, বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, শিল্পী এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যাঁদের ঢাকায় আগে থেকেই বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে, তাঁরাই আবার এসব প্রকল্পে বরাদ্দ পেয়েছেন। ফলে বরাদ্দ পাওয়া জমিতে বাড়ি নির্মাণ না করে ফেলে রাখা কিংবা হাতবদল করে বিক্রি করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে জমির দাম বেড়েছে, আবাসন আরও ব্যয়বহুল হয়েছে। এমনকি রাজউকের ফ্ল্যাটের দাম এক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতে স্পষ্ট, আবাসন সংকট কমানোর বদলে এসব প্রকল্প কার্যত জমির বাজার সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।

শুধু বরাদ্দ অনিয়ম নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও রাজউকের দুর্বলতা স্পষ্ট। পূর্বাচলে কিছু প্রধান সড়ক তৈরি হলেও অভ্যন্তরীণ সড়ক, গণপরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়োনিষ্কাশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা আজও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। ফলে যারা সেখানে বসবাস করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ব্যক্তিগত পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। এই অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ পূর্বাচলে বসবাসে আগ্রহী হচ্ছেন না।

ঝিলমিল আবাসন প্রকল্পের অবস্থা আরও হতাশাজনক। নির্মাণকাজ তো দূরের কথা, দীর্ঘদিন প্রকল্প এলাকা ফাঁকা পড়ে থাকায় অনেক জায়গা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে—এমন তথ্য জাতীয় গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে রাজউক বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও তাতে কার্যত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এতে বোঝা যায়, কাগুজে নির্দেশনা দিয়ে বাস্তব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

রাজউকের এসব প্রকল্পে একটি মৌলিক পরিকল্পনাগত ত্রুটি শুরু থেকেই ছিল। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য প্লটভিত্তিক আবাসন মডেল নয়, বরং ফ্ল্যাট বা কমিউনিটি হাউজিংভিত্তিক পরিকল্পনাই বেশি বাস্তবসম্মত ছিল। একই সঙ্গে প্রকল্প শুরুর আগেই নাগরিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। তা না করে জমি বরাদ্দ দেওয়াই প্রাধান্য পেয়েছে। এর ফল—রাষ্ট্রীয় মূল্যবান জমির অপচয় এবং আবাসন সংকটের আরও তীব্রতা।

তিন দশক ধরে একের পর এক আবাসন প্রকল্প নেওয়া হলেও রাজউক আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এটি শুধু পরিকল্পনার ব্যর্থতা নয়, বরং নগরায়ণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন। প্রকল্প ঘোষণা করাই সাফল্য নয়; সময়মতো ও সঠিকভাবে বাস্তবায়নই মূল বিষয়।

এই বাস্তবতায় রাজউক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত আবাসন নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও বসবাসযোগ্য আবাসন গড়ে তোলাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। বিশেষ সুবিধাগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ নয়, নাগরিকদের বাসস্থানের অধিকার রক্ষাই রাজউকের প্রধান দায়িত্ব—এ কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার সময় এখনই।

অতিথি লেখক : বিভাগীয় প্রধান, দৈনিক এখনই সময়।

- Advertisement -spot_img
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ

- Advertisement -spot_img

এই বিভাগের আরও

- Advertisement -spot_img