হুমায়ুন কবীর হেলালী : একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হয় না—এ কথা তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত। স্থানীয় সরকারই নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রথম ও সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সংযোগস্থল। এখান থেকেই গণতান্ত্রিক চর্চার সূচনা হয়, তৈরি হয় জবাবদিহি, অংশগ্রহণ ও সুশাসনের সংস্কৃতি। অথচ বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা, সময়ক্ষেপণ, অতিরিক্ত ব্যয় ও সহিংসতার ঝুঁকিতে আবদ্ধ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের মৌলিক দায়িত্ব জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করা। একই অনুচ্ছেদের ১১৯(২) ধারায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ হিসেবে কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক বিন্যাসই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গৌণ করে রেখেছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচন কখনোই একটি সমন্বিত, পরিকল্পিত ও সময়ানুগ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারেনি।
বর্তমানে দেশে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ তিন জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদসহ মোট সাত ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আলাদা আইনে পরিচালিত, মেয়াদ ও নির্বাচন পদ্ধতিও ভিন্ন। এর ফলে একটি সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে সাত বা তার বেশি ভিন্ন ভিন্ন তফসিলে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। সঙ্গে যুক্ত হয় মামলা-মোকাদ্দমার কারণে স্থগিত নির্বাচন। এর ফল – দেশ কার্যত সারাবছরই নির্বাচনী ডামাডোলে অস্থির থাকে।
এই বিচ্ছিন্ন ও দীর্ঘসূত্র নির্বাচনী ব্যবস্থার আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যয় বিপুল। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা এবং নিয়োজিত ছিল প্রায় ১৯ লাখ ৬২ হাজার জনবল। অথচ নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একই নির্বাচন ৬০০–৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে, অর্ধেকের কম জনবল দিয়ে এবং ২২৫ দিনের পরিবর্তে মাত্র ৪৫ দিনে সম্পন্ন করা সম্ভব – এমন বাস্তবসম্মত হিসাব রয়েছে।
শুধু ব্যয় নয়, স্থানীয় নির্বাচনগুলো সহিংসতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক। অতীতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজারো মানুষ আহত বা পঙ্গু হয়েছেন। বিচ্ছিন্ন তফসিল, দলীয় প্রভাব এবং প্রশাসনিক ক্লান্তি এই সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
এই বাস্তবতায় সংবিধানের স্থানীয় সরকার ও নির্বাচনসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ – বিশেষ করে ৫৯, ৬০, ১১৮ ও ১১৯ – পুনঃপর্যালোচনা করা জরুরি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশনের একটি মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার কাঠামো, মেয়াদ ও নির্বাচনকে সমন্বিত একটি জাতীয় নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের আওতায় আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো – সংবিধানে ব্যবহৃত ‘স্থানীয় শাসন’ শব্দটি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ধারণা ‘স্থানীয় সরকার’ অনুবাদের সময় বিকৃত হয়ে ‘স্থানীয় শাসন’ হয়েছে, যা ধারণাগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। এই শব্দগত সংশোধনও নীতিগত সংস্কারের অংশ হওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, সুষ্ঠু, অবাধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী স্থানীয় নির্বাচন কেবল নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নয় – এটি গণতন্ত্রকে টেকসই করার একটি মৌলিক শর্ত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাংবিধানিক স্পষ্টতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একসঙ্গে না এলে স্থানীয় সরকার কখনোই কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে উঠবে না।
অতিথি লেখক : বিভাগীয় প্রধান, দৈনিক এখনই সময়।


