সরকারি অধিগ্রহণ করা প্রায় ১০ একর জমি। মালিকানা নিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার পক্ষ থেকে আগেই প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও সেই জমিই কীভাবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকে বন্ধক রাখা হলো এবং এর বিপরীতে ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ অনুমোদন ও ছাড় করা হলো—এ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে ইউনিয়ন ব্যাংকের তৎকালীন খাতুনগঞ্জ শাখার ভূমিকা নিয়ে।
নথিপত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা মধ্য হালিশহর মৌজার প্রায় ৯৫৭ শতক বা ৯ দশমিক ৫৭ একর জমি ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর নামে বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের হিসাবে ওই ঋণের আসল ও সুদসহ পাওনা দাঁড়ায় ২২ কোটি ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৬২২ টাকা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সরকারি অধিগ্রহণের জমি নিয়ে ওয়াসার আগের সতর্কীকরণ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক কীভাবে ওই সম্পত্তির মালিকানা যাচাই করে বন্ধক গ্রহণ করল?
ব্যাংকের নথি ও নিলাম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জের ১১৭ আমির মার্কেটের (হাসান চেম্বার) ঠিকানায় মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের নামে ঋণসুবিধা দেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে ইদ্রিস মিয়া ছিলেন জমির মালিক, বন্ধকদাতা ও মূল জামিনদার। তাঁর স্ত্রী আলীউননেছা খাতুন, ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহীম হাসান এবং সালমা বেগম নামের আরেক নারীও বন্ধকদাতা ও জামিনদার হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
নিলামের আগে ওয়াসার সতর্কবার্তা
ঋণ দীর্ঘদিন পরিশোধ না হওয়ায় অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দেয় ইউনিয়ন ব্যাংক। বিজ্ঞপ্তিটি ১৫ নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়।
নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে মধ্য হালিশহর মৌজার আরএস দাগ ১১১, ১১২, ১১১/১৩৭, ১১১/১৩৮, ১১১/১২৯ এবং বিএস দাগ ১৯২৪, ১০৭ ও ১০৫ নম্বরের মোট ৯৫৭ শতক জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা মৌজায় ৬ হাজার ৩০০ বর্গফুটের তিনতলা বাণিজ্যিক ভবনসহ পাঁচ শতক জমিও তফসিলে রাখা হয়।
কিন্তু নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে ওয়াসার। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম ওয়াসার তৎকালীন সচিব শারমিন আলম ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপককে চিঠি দেন।
চিঠিতে ওয়াসা জানায়, নিলাম তফসিলের মধ্য হালিশহর মৌজার সম্পত্তিটি ১৯৬২-৬৩ সালে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি। চিঠিতে আরও বলা হয়, সালমা বেগমসহ একটি স্বার্থান্বেষী মহল জাল দলিল তৈরি করে ওই জমি আত্মসাতের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে ২০০৬ ও ২০১১ সালেও ওয়াসার পক্ষ থেকে জনসাধারণের জন্য সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল।
অর্থাৎ ব্যাংক যখন ওই জমি বন্ধক নেয়, তখন সম্পত্তিটির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার নথিতে আগে থেকেই ছিল—এমন তথ্যই ওয়াসার চিঠিতে উঠে আসে।
তাহলে ব্যাংকের ‘সার্চ অ্যান্ড টাইটেল ভেরিফিকেশন’ কোথায়?
ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে সম্পত্তি বন্ধক নেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকানা, দখল, খতিয়ান, দাগ, পূর্বের দলিল ও সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওয়াসার দাবি অনুযায়ী, যে জমি বহু বছর আগে সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, সেটিই কীভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলো—এ প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
বিশেষ করে প্রায় ১০ একর জমির বিপরীতে ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকের পক্ষ থেকে করা ‘সার্চ অ্যান্ড টাইটেল ভেরিফিকেশন’-এর কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াসার ২০২০ সালের চিঠির অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছিল। ফলে বিষয়টি জানার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নিলামে ওঠার আগেই জানা গেল সরকারি সম্পত্তি
নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ওয়াসার আপত্তির বিষয়টি ব্যাংকের সামনে আসে। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যাংকের নিজস্ব আইন ও সম্পত্তি যাচাই প্রক্রিয়ায় কেন সরকারি অধিগ্রহণের বিষয়টি ধরা পড়ল না?
এদিকে ঋণখেলাপির ঘটনায় ব্যাংক বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নিলেও ওয়াসার আপত্তির কারণে সম্পত্তিটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।
সেই ইদ্রিস মিয়াই এখন ওয়াসার চেয়ারম্যান
এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মেসার্স আজমির ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াই এখন চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান। গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তাঁকে তিন বছরের জন্য এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের বিপরীতে ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জমি বন্ধক রাখার অভিযোগ রয়েছে এবং ওই ঋণ আদায়ে ব্যাংক নিলামের উদ্যোগও নিয়েছিল।
ফলে শুধু ইদ্রিস মিয়ার ভূমিকা নয়, সরকারি জমির মালিকানা যাচাই না করেই ব্যাংক কীভাবে এত বড় ঋণ দিল—সেটিও এখন তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষ করে ওয়াসা যখন ২০২০ সালেই ব্যাংককে লিখিতভাবে জানায় যে জমিটি সরকারি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা, তখন ঋণ অনুমোদন, সম্পত্তি মূল্যায়ন, আইনগত যাচাই এবং বন্ধক গ্রহণের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সম্পত্তি জাল দলিলের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় দেখিয়ে ব্যাংকঋণ নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি, সেই দলিল ও মালিকানা যাচাইয়ে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ছিল কি না—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
চট্টগ্রাম ওয়াসার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি কীভাবে ব্যাংকের বন্ধকী সম্পত্তিতে পরিণত হলো, আর সেই জমির বিপরীতে ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ কীভাবে ছাড় হলো—এই দুই প্রশ্নের উত্তরই এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে।


